
সমুদ্র দেখতে এসে আনন্দের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ পর্যটক। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন। প্রিয়জনদের হারিয়ে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতাল ও ঘটনাস্থলের পরিবেশ।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে জেলা প্রশাসন। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে অনিরাপদ উল্লেখ করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদন ছাড়াই প্রায় দুই বছর ধরে রিসোর্টটি পরিচালিত হচ্ছিল বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
একই পরিবারের ছয়জনসহ নিহত ১০
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। তাঁরা সবাই একই পরিবারের সদস্য।
এ ছাড়া নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯) নামে এক স্কুলশিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি ঢাকার আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তাঁর স্বামী দেওয়ান ফয়সাল ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি।
অন্য দুই নিহত পর্যটক হলেন জিহাদ হাওলাদার ও আকিবুল ইসলাম।
স্ত্রী ও স্বজনদের হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন আশিকুল
অগ্নিকাণ্ডে স্ত্রীসহ পরিবারের ছয় সদস্যকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন আশিকুল ইসলাম। ঢাকার বনশ্রী থেকে স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার তাঁরা কক্সবাজারে পৌঁছান। শনিবার তাঁদের ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আশিকুল জানান, শনিবার সকালে আগুন দেখে তাঁর স্ত্রী তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেন। এরপর পাশের কক্ষে থাকা স্বজনদের সতর্ক করতে যান তিনি। একপর্যায়ে জানালা ভেঙে নিচে লাফ দিয়ে বের হতে সক্ষম হলেও স্ত্রীকে আর উদ্ধার করতে পারেননি।
দুই বান্ধবী বের হলেও আটকে পড়েন নাসরিন
অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো স্কুলশিক্ষক নাসরিন আক্তার মুক্তা ছোটবেলার দুই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন।
নাসরিনের স্বামী দেওয়ান ফয়সাল তাঁর বান্ধবীদের বরাত দিয়ে জানান, গত বৃহস্পতিবার তাঁরা ওই রিসোর্টে ওঠেন। শনিবার সকালে তাঁর দুই বান্ধবী কক্ষ থেকে বের হতে পারলেও নাসরিন ভেতরে ছিলেন। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় তিনি আর বের হতে পারেননি। তাঁদের রোববার বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা ছিল।
দগ্ধ ছয়জন হাসপাতালে
অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ছয়জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁরা হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দিন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে আগুন
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই আগুন কাঠের তৈরি ভবনটির বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
তিনতলা রিসোর্টটির নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ। ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। আগুন লাগার সময় কয়েকটি বিকট শব্দ শোনার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অগ্নিকাণ্ডে রিসোর্টের পাশের একটি মিষ্টি ও বিস্কুটের দোকানও আংশিক পুড়ে যায়।
দোকানটির মালিক স্থানীয় বাসিন্দা গিয়াসউদ্দিন জানান, তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁর স্ত্রী আগুন লাগার খবর দিলে তিনি ছুটে এসে দেখেন, পাশের রিসোর্টটি জ্বলছে। আগুনে তাঁর দোকানের বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রিসোর্টটিতে কীভাবে আগুন লেগেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানিয়েছেন, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি জানান, তিনতলা কাঠের ভবনটির নিচতলায় রেস্তোরাঁ এবং ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের স্থাপনা পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ।
কউকের অনুমোদনও ছিল না, পলাতক মালিক
প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই প্রায় দুই বছর ধরে রিসোর্টটি পরিচালনা করে আসছিলেন এর মালিক তানভীর আহমেদ। তিনি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বাসিন্দা। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। দুর্ঘটনার পর তাঁর প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন জানান, প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না। এ বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হলেও মালিক রিসোর্টটি সরিয়ে নেননি। বরং অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান জানান, তদন্তে আগুনের সূত্রপাত, প্রাণহানির কারণ, রিসোর্টের অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের ভবন থেকে বের হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হবে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় টুপটুপ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক সুমনকে শনিবার সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার করেছে উখিয়া থানা-পুলিশ। এ ঘটনায় একটি মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান।



